জন্মশতবর্ষে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য : জীবন ও সাহিত্য / Sukanta Bhattacharjee Birth Centenary

“এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব/ আমি নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার”

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তখন বেশ অসুস্থ, কিন্তু তিনি কখনই হতাশ ছিলেন না। পরবর্তী নতুন প্রজন্মের জন্য তিনি শোষণমুক্ত এক পৃথিবী গড়ে তোলার শপথ নিয়েছিলেন তার ছাড়পত্র কবিতায়।

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় বলেছেন, মাত্র ১৪ বছর বয়সে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের মধ্যে যে কাব্য প্রতিভার পূরণ ঘটেছিল, যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞার বিকাশ ঘটেছিল, এক কথায় অকল্পনীয়।

সময়টা ছিল ১৯৩৭ সাল। কবি সুকান্ত তার মাকে হারালেন। মা ছিলেন সুনীতি ভট্টাচার্য। তিনি ছিলেন একজন আত্মমর্যাদা সম্পন্ন নারী। তিনি নিয়মিত রামায়ণ মহাভারত পাঠ করতেন, পাঠ করতেন সুর করে। অবসর সময়ে কাশীরামের কৃত্তিবাসই ছিল তাঁর সঙ্গী। জীবনীকাররা বলেন, মায়ের সুর করে পাঠ করা সেই রামায়ণ মহাভারতই ছিল কবি সুকান্তের কাব্যপ্রতিভার অন্যতম উৎস।

তবে আরেকজন নারীর ভূমিকা কবি সুকান্তের জীবনের ছিল অত্যন্ত গভীর। তিনি হলেন রানীদি, কবির জ্যাঠতুতো দিদি। এই রাণীদির কোলে চড়েই শৈশবে তিনি বড় হয়েছেন। রাণীদির কন্ঠস্থ ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কথা ও কাহিনী’র বহু কবিতা। শিশু সুকান্তকে কোলে নিয়ে এ-ঘর ও—ঘর করার ফাঁকে ফাঁকে রাণীদি আপন মনে রবীন্দ্রনাথের কবিতার পর কবিতা আবৃত্তি করতেন। আর সেসময় শিশু সুকান্ত রাণীদির মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতেন। জীবনীকাররা একথাও বলেন যে, কবির কাব্যপ্রতিভার বীজ তখনই বপন করা হয়েছিল। প্রসঙ্গক্রমে আপনাদের বলে রাখি, এই রানীদিই কিন্তু কবির নামকরণ করেছিলেন। ‘সুকান্ত’ --- ‘সুকান্ত ভট্টাচার্য’।

তবে আরেকজন মানুষ কিন্তু কবি সুকান্তের কাব্য প্রতিভার উন্মেষে, পরোক্ষভাবে, গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। তিনি হলেন বাবা নিবারণচন্দ্র ভট্টাচার্য, তিনি ছিলেন একজন বই-ব্যবসায়ী। তা বই ব্যবসার সুবাদে বাড়িতে থরে থরে বই সাজানো থাকত, আর কবি সুকান্ত সেসব সেসব বইয়ের মধ্যে সাহিত্যনির্ভর বইগুলি বেছে নিয়ে সবার অলক্ষ্যে গোগ্রাসে গিলতান।‌ বলাবাহুল্য, এভাবেই শৈশবে কবির জীবনে সাহিত্যনির্ভর একটা শক্তপোক্ত, একটা সুবেদী ভীত তৈরি হয়েছিল।

দুর্ভাগ্যক্রমে মা সুনীতিদেবী, রানীদি ---- এঁরা কেউই বেশিদিন বাঁচেননি। ১৯৩৭ সালের প্রথমদিকে হঠাৎ মারা গেলেন রানীদি, আর শেষের দিকে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন কবির মা, সুনিতিদেবী।

কবির একজন বৈমাত্রেয় ভাই ছিলেন--- সৎ দাদা—নাম মনমোহন ভট্টাচার্য। তাঁর স্ত্রী কবিকে ভীষণ স্নেহ করতেন। মাতৃহারা ছেলেটিকে তিনি মায়ের ভালোবাসা দিয়ে ভরপুর করে রেখেছিলেন। সে সময়ে কবির লেখা ছোট ছোট ছড়া – সে সব তিনি মন দিয়ে পড়তেন, কবিকে উৎসাহ দিতেন। একদিন উপনয়ন উপলক্ষ্যে তিনি কবিকে একটা টাকা দিয়েছিলেন। সেই টাকা কিভাবে খরচ করা যায়, তা নিয়ে কবি সুকান্ত বন্ধুবর ভূপেন ভট্টাচার্যের সঙ্গে পরামর্শ করেন। বন্ধু প্রস্তাব দিলেন, তোর মাথায় এত যে কালো চুল, এই চুলের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখা দরকার। অবশেষে বন্ধুর পরামর্শে বৌদির দেওয়া সেই টাকায় কবি সুকান্ত চারটে পাসপোর্ট সাইজের ফটো তুলেছিল। বলাবাহুল্য, তার গালে হাত দেওয়া এই ছবিটি সেই সময়ের তোলা ছবি।

যাইহোক একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সুকান্ত ভট্টাচার্য সত্যিই এক অবিস্মরণীয় বিস্ময়। মাত্র একুশ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি যে বিপুল সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক কর্মযজ্ঞ সম্পাদন করে গিয়েছেন, তা কেবল প্রতিভার স্ফুরণ নয়, বরং এক ঐতিহাসিক বিপ্লবের দলিল। তাঁকে প্রায়শই 'কিশোর কবি' বা 'রবীন্দ্র-উত্তর বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ' হিসেবে অভিহিত করা হয়। কিন্তু এই অভিধাগুলি তাঁর সৃষ্টির গভীরতা ও ব্যাপ্তিকে সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করতে অক্ষম কেনোনা তিনি ছিলেন ১৯৪০-এর দশকের উত্তাল বাংলার—মহামন্বন্তর, বিশ্বযুদ্ধ, দাঙ্গা এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের সন্ধিক্ষণের—সবচেয়ে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ।

সুকান্তকে বুঝতে হলে তাঁর সময়কে বোঝা আবশ্যিক। তাঁর কবিতা কোনো শূন্যস্থান বা বিলাসিতা থেকে জন্ম নেয়নি; তা ছিল সমকালের দগদগে ঘা ও রক্তের দলিল।

সুকান্ত ভট্টাচার্য ১৯২৬ সালের ১৫ই আগস্ট কলকাতায় মামাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। সুকান্তের প্রথাগত শিক্ষা শুরু হয় কমলা বিদ্যামন্দিরে এবং পরে তিনি বেলেঘাটা দেশবন্ধু হাই স্কুলে ভর্তি হন । ১৯৪৫ সালে তিনি প্রবেশিকা (ম্যাট্রিকুলেশন) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন কিন্তু অকৃতকার্য হন । এই 'ফেল' করা মানে কিন্তু এই নয় যে, তার কোন মেধা ছিল না। কোনো মেধার অভাব ছিল না। আসলে অনেক আগে থেকেই, সেই ১৯৪২ থেকেই তিনি পুরোদস্তুর একজন রাজনৈতিক কর্মী। এই সময় থেকেই মার্কসবাদী ভাবদারায় গড়ে উঠেছিল তাঁর জীবন, তাঁর সাহিত্য।

চল্লিশের দশকে কলকাতা শহরের ছবিটি দ্রুত পাল্টে যাচ্ছিল। একদিকে কংগ্রেসের ব্রিটিশ বিরোধী ভারত ছাড়ো আন্দোলন, অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা, জাপানি বোমার আতঙ্ক, তেমনি দেশের অভ্যন্তরে ফ্যাসি-বিরোধী আন্দোলন, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন --- এসব কিছুর ঢেউ মহুর্মুহু আছড়ে পড়ছিল কলকাতা শহরের বুকে। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্য-ও এক সুতীব্র রাজনৈতিক চেতনায় সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শের কমিউনিস্ট আন্দোলনে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়লেন। দিনরাত নাওয়া-খাওয়া ভুলে কলকাতা শহরের এ প্রান্ত থেকে সে প্রান্ত চষে বেড়ালেন সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা জাগানোর কঠিন কাজ নিয়ে।

তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হলো ‘কিশোর বাহিনী’। ১৯৪৩-৪৪ সালের দিকে তিনি এই সংগঠনটির হাল ধরেন। এটি ছিল কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র ও যুব শাখার আদলে গঠিত ছোটদের একটি সংগঠন। সংগঠনটির উদ্দেশ্য ছিল কিশোরদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা, দেশপ্রেম এবং সমাজসেবার বীজ রোপণ করা। বলাবাহুল্য, তাঁর নেতৃত্বে এই কিশোরবাহিনী দ্রুত প্রসার লাভ করে। কলকাতার বিভিন্ন পাড়া থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যন্ত সংগঠনটির শাখা ছড়িয়ে পড়ে। শুনলে বিশ্বাস হবে না যে, তার পরিচালনার গুনেই, তার নেতৃত্বেই সংগঠনটির সদস্য সংখ্যা তখন হয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৩০,০০০ এবং কেন্দ্রের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৬০০ ।

এই সময়ে তিনি কি না কাজ করেছেন! কখনো তিনি দুর্ভিক্ষের সময় ত্রাণ বিতরণ করছেন, কখনো বা মহামারী প্রতিরোধে সদস্যদের নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় কাজ করছেন, কখনোবা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় সম্প্রীতি রক্ষার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন, আবার কখনো নিরন্ন মানুষদের জন্য লঙ্গরখানা খুলে সেই লঙ্গরখানা পরিচালনা করছেন, এর উপর আবার সংগঠনের যাবতীয় কাজকর্ম তিনি দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করছেন! খুব স্বাভাবিকভাবেই পাঠ্যবইয়ের পড়াশোনা তাঁর কাছে তখন গৌণ হয়ে পড়েছিল। সঠিক সময়ে খাওয়াদাওয়া সেসব তার কাছে গৌণ হয়ে পড়েছিল। এক অবিশ্বাস্য হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে তিনি মানুষের সর্বাত্মক সেবায় তিনি ব্রতী হয়েছিলেন। আর এই অমানুষিক পরিশ্রমের সময় ধীরে ধীরে সবার অলক্ষ্যে তার দেহে বাসা বেধেছিল এক মারন রোগ, যক্ষা --- টিউবারকিউলিসিস! কিন্তু তার সমাজসেবা, তার রাজনৈতিক কর্মকান্ড, তার লেখনি কখনোই থেমে থাকেনি।।

সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা প্রধানত রোমান্টিকতা বর্জিত, শানিত এবং সরাসরি। সুভাষ মুখোপাধ্যায় যথার্থই বলেছিলেন যে সুকান্তের কবিতা “কিশোর মনের স্বাভাবিক উচ্ছ্বাস নয়, বরং এক কঠিন ও কঠোর শপথ” ।

কবি সুকান্তের কাব্যদর্শন মূল প্রতিভাত হয় তার একটি কবিতায়, যে কবিতাটির নাম ‘হে মহাজীবন’।কবিতার শুরুতেই তিনি কবিতাকে ছুটি দিচ্ছেন— লিখেছেন “কবিতা, তোমায় দিলাম আজকে ছুটি”। সেটা ছিল বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক মুহূর্ত।

রবীন্দ্রনাথ বা জীবনানন্দের কবিতায় যে পেলবতা ও নান্দনিকতা ছিল, সুকান্ত তা যেন সচেতনভাবে বর্জন করলেন। তিনি ধরলেন “গদ্যের কড়া হাতুড়ি”। লিখলেন “পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি”—এই একটি পংক্তিই বাংলা কবিতার মোড় যেন ঘুরিয়ে দিল। কবি সুকান্তের সাহিত্য হয়ে উঠলো শ্রমিকের হাতিয়ারের মতো শক্তিশালী ও কার্যকর।

তাঁর অন্যতম জনপ্রিয় কবিতা রানার, যা পরে শ্রদ্ধেয় সুরকার সলিল চৌধুরীর সুরে অমরত্ব লাভ করে, সেই কবিতা পড়লেই যেন মনে হয়, সে কবিতা যেন শ্রমজীবী মানুষের মহাকাব্য। তিনি রানারকে কেবল কর্মচারী হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন এক দিগন্ত-উন্মোচনকারী শ্রমিক হিসেবে। “রানার! রানার! এ বোঝা টানার দিন কবে শেষ হবে?”—এই প্রশ্নের মাধ্যমে তিনি শ্রমিকের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন।

আবার তিনি যখন দেশলাই কবিতা লেখেন, সিঁড়ি কবিতা লেখেন, সেসব কবিতায় তিনি রূপকাশ্রয়ে সেই সর্বহারা শ্রেণীর মানুষদের দেখিয়েছেন, যারা এককভাবে দুর্বল হলেও সঙ্ঘবদ্ধ ভাবে কিন্তু তারা রাষ্ট্রক্ষমতাকে উল্টেপাল্টে দিতে পারে। সেখানেও তিনি শোষিত শ্রেণীর পুঞ্জিভূত সুপ্ত ক্ষোভের প্রকাশ ঘটিয়েছেন ।

প্রসঙ্গত আমার মনে পড়ছে তার সেই স্লেশাত্মক কবিতাটির কথা যে কবিতাটির নাম ‘একটি মোরগের কাহিনী’। একটি মোরগ প্রাসাদের বাইরে থেকে প্রাসাদের ভেতরের মানুষজনের সুস্বাদু খাবার খেতে দেখছে, তারও ইচ্ছে হয় সে সুস্বাদু খাবার খেতে, অথচ একদিন সেই মোরগ প্রাসাদে প্রবেশ করে খাদক হিসেবে নয়, টেবিলের খাদ্য হিসাবে। তিনি কবিতায় সমাজের প্রান্তিক মানুষের সমাজের গরিব মানুষের নিয়তির চিত্রটি চমৎকার ভাবে তীক্ষ্ণভাবে তিনি ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন।

সত্যি কথা বলতে, তার কবিতার সম্ভার নিয়ে আলোচনা করলে সে আলোচনা শেষ হবার নয়।

যক্ষ্মা বা টিউবারকিউলোসিস ধরা পড়ার পর কবি সুকান্তকে প্রথমে রেড এইড কিওর হোম এবং পরে যাদবপুর টি.বি. হাসপাতালে ভর্তি করা হয় । তখনকার দিনে স্ট্রেপ্টোমাইসিন (যক্ষ্মার ওষুধ) সুলভ ছিল না, ফলে যক্ষা মানে ছিল কার্যত মৃত্যুদণ্ড ।

১৯৪৭ সালের ১৩ই মে, মাত্র ২০ বছর ৯ মাস বয়সে, এই ক্ষণজন্মা কবির জীবনাবসান ঘটে ।

সুকান্তের মৃত্যুর পর তাঁর কবিতাগুলি আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। বিশেষ করে সুরকার সলিল চৌধুরী সুকান্তের কবিতায় সুরারোপ করে সেগুলিকে গণসঙ্গীতে রূপান্তর করেন। ‘রানার’, ‘অবাক পৃথিবী’, ‘ধূপের মতো’—হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও অন্যান্য শিল্পীদের কণ্ঠে গাওয়া এই গানগুলো সুকান্তকে বাঙালির ড্রয়িংরুম থেকে মিছিলে এবং হৃদয়ে পৌঁছে দেয় ।

সুকান্তের কবিতার সমালোচনা করতে গিয়ে অনেকে বলেছেন সুকান্তের কবিতা আসলে প্রোপাগান্ডা ছাড়া আর কিছুই নয়, অনেকে বলেছেন তার কবিতা অপরিণত। অনেকে মনে করেছিলেন বিশ্বায়নের যুগে সুকান্ত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

আমরা দেখেছি, সাম্প্রতিক সময়ে এনআরসি-সিএএ (NRC-CAA) বিরোধী আন্দোলনে কলকাতার রাজপথে সুকান্তের কবিতার লাইন:

“দেওয়ালে দেওয়ালে মনের খেয়ালে লিখি কথা / আমি যে বেকার পেয়েছি লেখার স্বাধীনতা”— সেসব লাইন বজ্রনির্ঘোষে ফিরে এসেছে ।

আবার ২০২৪ সালে আর জি কর হাসপাতালের ঘটনার প্রেক্ষিতে যে গণআন্দোলন গড়ে ওঠে, সেখানেও সুকান্তের কবিতার লাইন :

“জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার / তবু মাথা নোয়াবার নয়” -- সেসব পংক্তিগুলি পোস্টার ও স্লোগানে ব্যবহৃত হয়েছে । রাষ্ট্রীয় অবহেলা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর কবিতা আজও ধারালো অস্ত্র।

তা, বুদ্ধদেব বসু থেকে শুরু করে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়—সবাই সুকান্তের প্রতিভার স্বীকৃতি দিয়েছেন। কেউ কেউ তাঁকে “কিশোর কবি” বলে তাঁর সৃষ্টিকে অপরিপক্ক বলতে চেয়েছেন। কিন্তু বুদ্ধদেব বসুর মতো কড়া সমালোচকও স্বীকার করেছেন যে, সুকান্ত বেঁচে থাকলে বাংলা সাহিত্য আরও অনেক কিছু পেত, তবে তিনি যা রেখে গেছেন তা-ই তাঁকে অমর করার জন্য যথেষ্ট ।

সুকান্ত ভট্টাচার্য বাস্তবিকই ছিলেন এক অসমাপ্ত বিপ্লব। মাত্র সাত-আট বছরের সাহিত্যিক জীবনে তিনি বাংলা কবিতার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন যে কবিতা কেবল ফুলের সুবাস নয়,বারুদের গন্ধও হতে পারে।

আজকের এই আলোচনা শেষ শেষ করার আগে শুধু এটাই বলব আমি, সুকান্ত ভট্টাচার্য কেবল একটি নাম নয়, তিনি একটা একটা স্পিরিট। যতদিন পৃথিবীতে নিরন্ন মানুষের খিদে থাকবে, বৈষম্য থাকবে, এবং শোষক ও শোষিতের দ্বন্দ্ব থাকবে, ততদিন সুকান্ত ভট্টাচার্য প্রাসঙ্গিক থাকবেন।

রবীন্দ্রনাথ যদি হন বাংলা সাহিত্যের ধ্রুবতারা, নজরুল যদি হন ধূমকেতু, তবে সুকান্ত হলেন সেই উল্কা—যিনি ক্ষণিকের জন্য জ্বলে উঠে আমাদের দেখিয়ে দিয়ে গেলেন যে অন্ধকার যত গভীরই হোক, তাকে ভেদ করার শক্তি তারুণ্যের স্পর্ধার মধ্যেই নিহিত।

(বিষয়টি ভিডিওতে দেখতে এখানে ক্লিক করুন।)

তথ্যসূত্র

১) সুকান্ত ভট্টাচার্য by জগন্নাথ চক্রবর্তী

২) Marxist Indiana : An Encyclopaedia

৩) The Statesman

৪) The daily observer

৫) আনন্দবাজার পত্রিকা

৬) উইকিপিডিয়া

৭) google নেটওয়ার্ক

৮) জেমিনি

Date : 11th February 2026 .................................................................................... copyright: The Galposalpo

Comments

Popular posts from this blog

জীবনানন্দ দাশ ও লাবণ্যদেবী : বিয়ের গল্প / Jibanananda Das and Labanya Debi : Marriage Story

বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দেমাতরম : উত্থান-পতনের আশ্চর্য ইতিহাস / History : Vande Mataram by Bankim Chandra

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় : প্রথম চুম্বন, মদ্যপান আর প্রেমের গল্প / Sunil Gangopadhyay : Story of First Kiss, Wine and Love